জন্ম নিবন্ধন সনদে ভুল থাকা মানেই ভবিষ্যতে NID, পাসপোর্ট বা স্কুল-সার্টিফিকেট বানানোর সময় নতুন করে ঝামেলায় পড়া। নামের বানান ভুল, জন্ম তারিখে গরমিল, বাবা-মায়ের নামে অমিল সম্পর্কিত সমস্যাগুলো এখন আর ইউনিয়ন পরিষদের এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে সমাধান করতে হয় না। ঘরে বসে মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়েই পুরো আবেদন সম্পন্ন করা যায়।
এই গাইডে ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে কীভাবে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করবেন, কোন সংশোধনে কী কাগজপত্র লাগবে, ফি কত, আবেদন ফরম কীভাবে ডাউনলোড করবেন এবং জমা দেওয়ার পর আবেদনের অবস্থা কীভাবে চেক করবেন।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কী কী লাগে?
কোন তথ্য সংশোধন করছেন তার উপর ভিত্তি করে কাগজপত্র ভিন্ন হয়। সাধারণভাবে যেগুলো কাজে লাগে:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার বা চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র
- বিশেষ ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট
- পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র
- হোল্ডিং ট্যাক্স বা ইউটিলিটি বিলের রশিদ (ঠিকানা সংশোধনে)
সংশোধনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঠিক কোন কাগজ কোন পরিস্থিতিতে লাগবে তার বিস্তারিত তালিকা পাবেন আমাদের সংশোধনের কাগজপত্র নির্দেশিকা পেজে।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদন করার নিয়ম
নিচে পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে দেখানো হলো।
ধাপ ১: bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
সবার আগে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের জন্য নির্ধারিত অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এজন্য ব্রাউজারে গিয়ে bdris.gov.bd/br/correction টাইপ করে এন্টার করুন।
ওয়েবসাইটটি ওপেন হলে উপরের মেন্যু অংশে “জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধন আবেদন” নামে একটি অপশন দেখতে পাবেন। সেখানে ক্লিক করুন।এই অপশনে ক্লিক করার পর আপনি জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন সংক্রান্ত মূল পেজে চলে যাবেন।
বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন।

ধাপ ২: নিবন্ধন নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে তথ্য খুঁজুন
এই ধাপে আপনাকে আপনার জন্ম নিবন্ধনের তথ্য খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য নির্দিষ্ট ঘরে ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ সঠিকভাবে বসান। সব তথ্য ঠিকভাবে দেওয়ার পর “অনুসন্ধান” (Search) বাটনে ক্লিক করুন।
যদি আপনার জন্ম নিবন্ধন নম্বরটি ১৭ ডিজিটের না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার জন্ম নিবন্ধনটি এখনও অনলাইনে যুক্ত হয়নি। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জন্ম নিবন্ধন অফিস বা উপজেলা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদটি অনলাইন করতে হবে। অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আপনাকে একটি ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দেওয়া হবে।
অনুসন্ধান বাটনে ক্লিক করার পর আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদের কিছু প্রাথমিক তথ্য স্ক্রিনে দেখাবে। সেখানে নাম, জন্ম তারিখসহ তথ্যগুলো ভালো করে মিলিয়ে নিন। সবকিছু ঠিক থাকলে “নির্বাচন করুন” বাটনে ক্লিক করুন এবং পরবর্তী ধাপে যান।

ধাপ ৩: নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করুন
এই ধাপে আপনাকে সেই নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করতে হবে, যেখান থেকে আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদটি তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ আপনি যে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার আওতায় জন্ম নিবন্ধন করেছেন, সেই অফিসের ঠিকানা এখানে নির্ধারণ করতে হবে।
এর জন্য ধারাবাহিকভাবে আপনার
- দেশ
- বিভাগ
- জেলা
- সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলা
নির্বাচন করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ সিলেক্ট করে অফিসটি যাচাই করুন।
সব তথ্য সঠিকভাবে নির্বাচন করা হলে পরবর্তী ধাপে যেতে “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: সংশোধনযোগ্য তথ্য নির্বাচন করুন
সনদের যে তথ্যগুলো ভুল আছে (নাম, জন্ম তারিখ, পিতা-মাতার নাম ইত্যাদি) সেগুলো সিলেক্ট করে পাশের ঘরে সঠিক তথ্য লিখুন। একাধিক তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে একইভাবে একটির পর একটি যোগ করুন। বানান ও তারিখ দুইবার মিলিয়ে দেখুন।
ধাপ ৫: সংশোধনের কারণ উল্লেখ করুন
এই ধাপে আপনি যে তথ্যগুলো সংশোধনের জন্য নির্বাচন করেছেন, সেগুলো একবার ভালো করে দেখে নিতে হবে। নিচের ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, এখানে উদাহরণ হিসেবে ৩টি তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

প্রতিটি সংশোধিত তথ্যের জন্য সংশোধনের কারণ নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে “ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে” এই অপশনটি সিলেক্ট করলেই যথেষ্ট হয়।
যদি জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্ম তারিখ সংশোধন করতে চান, তাহলে হাতে টাইপ না করে ক্যালেন্ডার অপশন থেকে সঠিক জন্ম তারিখটি নির্বাচন করুন। এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
সব তথ্য ও কারণ ঠিকভাবে দেওয়া হলে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে আরেকবার মিলিয়ে নিন, যেন পরে কোনো সমস্যা না হয়।
ধাপ ৬: ঠিকানার তথ্য পূরণ করুন
এই ধাপে আপনাকে জন্ম নিবন্ধন সনদে থাকা তথ্য অনুযায়ী জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন করতে হবে।
পেজটি একটু নিচে স্ক্রল করলে ঠিকানার জন্য আলাদা অংশ দেখতে পাবেন। সেখানে ধারাবাহিকভাবে জেলা ও উপজেলা সিলেক্ট করুন। যেসব তথ্য জন্ম নিবন্ধনে ইতোমধ্যে আছে, সেগুলোর সাথে যেন মিল থাকে সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন।
ধাপ ৭: আবেদনকারীর তথ্য ও মোবাইল যাচাই
আবেদনকারী নিজ, পিতা/মাতা, নাকি অভিভাবক তা নির্বাচন করুন। নিজে বা পিতা-মাতা ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করলে তার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও NID নম্বর দিতে হবে। এই ধাপে একটি সচল মোবাইল নম্বর দিতে হয় এবং সেখানে পাঠানো OTP কোড দিয়ে যাচাই সম্পন্ন করতে হয়। তাই আবেদনের সময় হাতের কাছে মোবাইলটি রাখুন।
ধাপ ৮: প্রমাণপত্র আপলোড করুন
সবুজ “সংযোজন” বাটনে ক্লিক করে প্রমাণপত্রের স্ক্যান কপি বা মোবাইলে তোলা স্পষ্ট ছবি আপলোড করুন (JPG/JPEG/PNG ফরম্যাটে)। ছবি যেন ঝাপসা না হয়, পর্যাপ্ত আলোয় তোলা হয় এবং লেখা স্পষ্ট বোঝা যায়। এছাড়া ফাইলের সাইজ যত ছোট রাখা যায় তত ভালো, ২ মেগাবাইটের নিচে রাখার চেষ্টা করুন।

ধাপ ৯: ফি পরিশোধ করুন
পেমেন্ট অপশন দুটো পাবেন:
- e-Payment: বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে ঘরে বসেই সরাসরি ফি পরিশোধ
- ফি আদায়: অফিসে গিয়ে নগদে ফি দেওয়ার অপশন সিলেক্ট করে রাখা
যেটাই বেছে নিন, ফি পরিশোধ করার আগে সব তথ্য আরেকবার ভালো করে মিলিয়ে নিন।
ধাপ ১০: আবেদন সাবমিট করুন
“সাবমিট” বাটনে ক্লিক করলে আবেদন জমা হয়ে যাবে এবং স্ক্রিনে একটি Application ID ও Reference Number দেখাবে। এই দুটো নম্বর অবশ্যই সংরক্ষণ করে রাখবেন। পরবর্তিতে স্ট্যাটাস চেক বা অফিসে যোগাযোগের সময় এগুলো কাজে লাগবে।
ধাপ ১১: সংশোধন আবেদন ফরম ডাউনলোড ও প্রিন্ট করুন
আবেদন জমা হওয়ার পর একই পেজ থেকে “Print” বা “Download” অপশনে ক্লিক করে আবেদনপত্রটি PDF আকারে ডাউনলোড করতে পারবেন। প্রিন্টার হাতের কাছে না থাকলে “Save as PDF” করে মোবাইলেই সংরক্ষণ করে রাখুন, পরে সাইবার ক্যাফে বা দোকান থেকে প্রিন্ট করিয়ে নিতে পারবেন।
প্রিন্ট করা ফরমের সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফটোকপি সংযুক্ত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে সরাসরি জমা দিতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদনের বর্তমান অবস্থা চেক
আবেদন জমা দেওয়ার পর সেটা কোন ধাপে আছে, যাচাই চলছে, অনুমোদিত হয়েছে, নাকি বাতিল হয়েছে তা ঘরে বসেই চেক করা যায়।
- ভিজিট করুন bdris.gov.bd/br/application/status
- আবেদনের ধরন হিসেবে “সংশোধন” নির্বাচন করুন
- আবেদনের সময় পাওয়া Application ID ও জন্ম তারিখ দিন
- “দেখুন” বাটনে ক্লিক করলেই বর্তমান অবস্থা দেখাবে
স্ট্যাটাসে “ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত” দেখালে সংশোধিত সনদ সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করতে পারবেন। সনদ সংগ্রহ করার পর নতুন তথ্য অনলাইনে সঠিকভাবে বসেছে কিনা অবশ্যই জন্ম নিবন্ধন যাচাই করে একবার নিশ্চিত হয়ে নিবেন।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ফি (দেশে ও বিদেশে)
জন্ম নিবন্ধন সনদ সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সরকারি ফি নির্ধারিত আছে। নিচের টেবিলে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত আবেদনকারীদের জন্য ফি-এর পরিমাণ সহজভাবে তুলে ধরা হলো
| সংশোধনের ধরণ | দেশে | বিদেশে |
|---|---|---|
| জন্ম নিবন্ধনের যেকোনো তথ্য সংশোধনের জন্য সাধারণ ফি | ১০০ টাকা | ২ ডলার |
| জন্ম তারিখ ব্যতীত শুধুমাত্র নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য | ৫০ টাকা | ১ ডলার |
| তথ্য সংশোধনের পর বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় মূল সনদের কপি সরবরাহ | বিনা ফিসে | বিনা ফিসে |
| বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় জন্ম নিবন্ধন সনদের নকল কপি সরবরাহ | ৫০ টাকা | ১ ডলার |
আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে করণীয়
পর্যাপ্ত প্রমাণপত্র না থাকা বা তথ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। এমন হলে
- বাতিলের কারণ জানতে স্ট্যাটাস পেজ বা সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করুন
- যে কাগজের অভাবে বাতিল হয়েছে সেটি জোগাড় করুন (প্রয়োজনে চেয়ারম্যান/কাউন্সিলরের সহায়তা নিন)
- সব প্রমাণপত্র ঠিক রেখে নতুন করে আবেদন জমা দিন
মনে রাখবেন, একটি সনদ সর্বোচ্চ ৪ বার সংশোধন করা যায়। তাই প্রতিবার আবেদনের আগে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
FAQs
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনে কত টাকা লাগে?
জন্ম তারিখ ছাড়া অন্যান্য তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি সাধারণত ৫০ টাকা। তবে যারা বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি, তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে ১ মার্কিন ডলার (USD) ফি প্রযোজ্য।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কত দিন সময় লাগে?
সাধারণত জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধন সম্পন্ন হতে ৫ থেকে ৭ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে। তবে অফিসের কাজের চাপ, ডকুমেন্ট যাচাই বা বিশেষ ক্ষেত্রে সময় কিছুটা বেশি লাগতেও পারে।
জন্ম নিবন্ধন কতবার সংশোধন করা যায়?
একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ সর্বোচ্চ ৪ বার পর্যন্ত সংশোধন করা যায়। অপ্রয়োজনীয় বা বারবার সংশোধনের আবেদন করলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে, তাই তথ্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা ভালো।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ফরম কোথায় জমা দিতে হবে?
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করার পর ফরমটি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট…
- ইউনিয়ন পরিষদ
- পৌরসভা
- অথবা সিটি কর্পোরেশন অফিসে
সরাসরি জমা দিতে হবে।
পাসপোর্ট দিয়ে কি জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা যায়?
হ্যাঁ। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রমাণপত্র হিসেবে পাসপোর্ট ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে নাম বা জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট একটি গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।
সঠিক নিয়মে ধাপগুলো অনুসরণ করলে এবং সঠিক প্রমাণপত্র জমা দিলে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আর ঝামেলার কাজ মনে হবে না। জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত আরও গাইড পেতে ঘুরে আসুন আমাদের Birth Certificate Guides পেজ থেকে।

Thanks for your Advice.