অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা এখন অনেকটাই সহজ হলেও বাস্তবে প্রথমবার করতে গেলে অনেকের কাছেই প্রক্রিয়াটি জটিল মনে হয়। নামের বানান ভুল, জন্ম তারিখ মিলছে না, বাবা–মায়ের নাম ভুলভাবে লেখা, এমন সমস্যা জন্ম নিবন্ধনে খুবই সাধারণ। কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানলে অনেকেই বুঝতে পারেন না, কোথা থেকে শুরু করবেন বা কোন ধাপে কী দিতে হবে।
এই পোস্টে আমরা জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়া একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সহজে তুলে ধরেছি। এখানে ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে কীভাবে সংশোধনের আবেদন করবেন, কোন তথ্যগুলো ঠিক করতে পারবেন, কী ধরনের কাগজপত্র লাগতে পারে এবং আবেদন জমা দেওয়ার পর কী করতে হয়।
আপনি যদি প্রথমবার জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য আবেদন করতে চান, তাহলে এই গাইডটি শেষ পর্যন্ত পড়লে পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কী কী লাগে?
জন্ম নিবন্ধন সনদ সংশোধনের জন্য সাধারণত কিছু প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে যেগুলো প্রয়োজন হয়ঃ
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট (যদি প্রযোজ্য হয়)
- সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার বা চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র
- বিশেষ ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট
- পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র
- হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ (কিছু ক্ষেত্রে)
সব ক্ষেত্রে সব ডকুমেন্ট লাগবে না। কোন তথ্য সংশোধন করা হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ধারণ করা হয়।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদন করার নিয়ম
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে প্রতিটি ধাপ খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
#ধাপ ১: bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
সবার আগে জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের জন্য নির্ধারিত অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। এজন্য ব্রাউজারে গিয়ে bdris.gov.bd/br/correction টাইপ করে এন্টার করুন।
ওয়েবসাইটটি ওপেন হলে উপরের মেন্যু অংশে “জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধন আবেদন” নামে একটি অপশন দেখতে পাবেন। সেখানে ক্লিক করুন।এই অপশনে ক্লিক করার পর আপনি জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন সংক্রান্ত মূল পেজে চলে যাবেন।
বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন।

#ধাপ ২: নিবন্ধন নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে জন্ম তথ্য বের করুন
এই ধাপে আপনাকে আপনার জন্ম নিবন্ধনের তথ্য খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য নির্দিষ্ট ঘরে ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ সঠিকভাবে বসান। সব তথ্য ঠিকভাবে দেওয়ার পর “অনুসন্ধান” (Search) বাটনে ক্লিক করুন।
যদি আপনার জন্ম নিবন্ধন নম্বরটি ১৭ ডিজিটের না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার জন্ম নিবন্ধনটি এখনও অনলাইনে যুক্ত হয়নি। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জন্ম নিবন্ধন অফিস বা উপজেলা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদটি অনলাইন করতে হবে। অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আপনাকে একটি ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর দেওয়া হবে।
অনুসন্ধান বাটনে ক্লিক করার পর আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদের কিছু প্রাথমিক তথ্য স্ক্রিনে দেখাবে। সেখানে নাম, জন্ম তারিখসহ তথ্যগুলো ভালো করে মিলিয়ে নিন। সবকিছু ঠিক থাকলে “নির্বাচন করুন” বাটনে ক্লিক করুন এবং পরবর্তী ধাপে যান।

#ধাপ ৩: নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করুন
এই ধাপে আপনাকে সেই নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করতে হবে, যেখান থেকে আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদটি তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ আপনি যে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার আওতায় জন্ম নিবন্ধন করেছেন, সেই অফিসের ঠিকানা এখানে নির্ধারণ করতে হবে।
এর জন্য ধারাবাহিকভাবে আপনার
- দেশ
- বিভাগ
- জেলা
- সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলা
নির্বাচন করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ সিলেক্ট করে অফিসটি যাচাই করুন।
সব তথ্য সঠিকভাবে নির্বাচন করা হলে পরবর্তী ধাপে যেতে “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন।
#ধাপ ৪: সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য নির্বাচন করুন
এই ধাপে আপনাকে জন্ম নিবন্ধন সনদের যেসব তথ্য ভুল রয়েছে, সেগুলো নির্বাচন করে সঠিক তথ্য যুক্ত করতে হবে। ফরমে সংশ্লিষ্ট অপশনগুলো থেকে যে তথ্যগুলো সংশোধন করতে চান (যেমন নাম, জন্ম তারিখ, বাবা–মায়ের নাম ইত্যাদি) সেগুলো সিলেক্ট করুন।
প্রতিটি নির্বাচিত তথ্যের পাশে নির্দিষ্ট ঘরে আপনার চাহিত ও সঠিক তথ্য লিখে দিন। যদি একাধিক তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে একইভাবে একটির পর একটি নির্বাচন করে সঠিক তথ্য বসাতে পারবেন।
সব তথ্য যুক্ত করার সময় বানান ও তারিখ ভালো করে মিলিয়ে নিন।
#ধাপ ৫: সংশোধিত তথ্য যাচাই করুন এবং কারণ উল্লেখ করুন
এই ধাপে আপনি যে তথ্যগুলো সংশোধনের জন্য নির্বাচন করেছেন, সেগুলো একবার ভালো করে দেখে নিতে হবে। নিচের ছবিতে যেমন দেখা যাচ্ছে, এখানে উদাহরণ হিসেবে ৩টি তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

প্রতিটি সংশোধিত তথ্যের জন্য সংশোধনের কারণ নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে “ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে” এই অপশনটি সিলেক্ট করলেই যথেষ্ট হয়।
যদি জন্ম নিবন্ধন সনদের জন্ম তারিখ সংশোধন করতে চান, তাহলে হাতে টাইপ না করে ক্যালেন্ডার অপশন থেকে সঠিক জন্ম তারিখটি নির্বাচন করুন। এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
সব তথ্য ও কারণ ঠিকভাবে দেওয়া হলে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে আরেকবার মিলিয়ে নিন, যেন পরে কোনো সমস্যা না হয়।
#ধাপ ৬: ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য পূরণ করুন
এই ধাপে আপনাকে জন্ম নিবন্ধন সনদে থাকা তথ্য অনুযায়ী জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন করতে হবে।
পেজটি একটু নিচে স্ক্রল করলে ঠিকানার জন্য আলাদা অংশ দেখতে পাবেন। সেখানে ধারাবাহিকভাবে জেলা ও উপজেলা সিলেক্ট করুন। যেসব তথ্য জন্ম নিবন্ধনে ইতোমধ্যে আছে, সেগুলোর সাথে যেন মিল থাকে সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখুন।
#ধাপ ৭: প্রমাণপত্র আপলোড করুন এবং আবেদন জমা দিন
সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর এই ধাপে আপনাকে আবেদনকারীর পরিচয় নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য কে আবেদন করছে তা সিলেক্ট করুন।
- যদি আবেদনকারী আপনি নিজে হন, তাহলে “নিজ” অপশনটি নির্বাচন করুন।
- জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন যদি পিতা বা মাতা করে থাকেন, তাহলে সেই অনুযায়ী পিতা/মাতা অপশন নির্বাচন করুন।
- আর আপনি যদি জন্ম নিবন্ধনধারীর আইনগত অভিভাবক হন, তাহলে “অভিভাবক” অপশন সিলেক্ট করুন।
নিজে, পিতা বা মাতা ছাড়া অন্য কেউ আবেদন করলে সেই আবেদনকারীর জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (ভোটার আইডি) নম্বর দিতে হবে।

এরপর সবুজ “সংযোজন” বাটনে ক্লিক করে সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের স্ক্যান কপি আপলোড করুন। চাইলে মোবাইল ফোন দিয়ে তোলা ছবিও আপলোড করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন—
- ছবিগুলো যেন পরিষ্কার ও ঝাপসা না হয়
- যথেষ্ট আলোতে তোলা হয়
- কাগজের লেখা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়
ডকুমেন্ট আপলোড শেষ হলে পেমেন্ট অপশনে “ফি আদায়” নির্বাচন করুন। এরপর একবার সব তথ্য ভালো করে যাচাই করে “সাবমিট” বাটনে ক্লিক করে আপনার সংশোধনের আবেদনটি জমা দিন।
আবেদন সফলভাবে জমা হলে একটি আবেদন নম্বর দেখাবে, যা ভবিষ্যতে আবেদন স্ট্যাটাস চেক করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখবেন।
#ধাপ ৮: জন্ম নিবন্ধন সংশোধন আবেদনপত্র ডাউনলোড ও প্রিন্ট করুন
অনলাইনে সংশোধনের আবেদন সফলভাবে জমা দেওয়ার পর আপনাকে একটি Application ID এবং Reference Number দেওয়া হবে। এই দুটি নম্বর অবশ্যই সংগ্রহ করে রাখবেন, কারণ পরবর্তীতে আবেদন স্ট্যাটাস চেক করা বা অফিসে যোগাযোগ করার সময় এগুলো প্রয়োজন হবে।
এরপর ওয়েবসাইট থেকে সংশোধন আবেদন ফরম ডাউনলোড করে প্রিন্ট করুন। প্রিন্ট করা ফরমটির সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন অফিসে সরাসরি জমা দিতে হবে।
অফিসে জমা দেওয়ার সময় আবেদন নম্বর ও প্রিন্ট করা ফরম ঠিকভাবে মিলিয়ে নিলে পরবর্তী প্রক্রিয়া সহজ হয়।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন ফি (দেশে ও বিদেশে)
জন্ম নিবন্ধন সনদ সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সরকারি ফি নির্ধারিত আছে। নিচের টেবিলে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত আবেদনকারীদের জন্য ফি-এর পরিমাণ সহজভাবে তুলে ধরা হলো
| সংশোধনের ধরণ | দেশে | বিদেশে |
|---|---|---|
| জন্ম নিবন্ধনের যেকোনো তথ্য সংশোধনের জন্য সাধারণ ফি | ১০০ টাকা | ২ ডলার |
| জন্ম তারিখ ব্যতীত শুধুমাত্র নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য | ৫০ টাকা | ১ ডলার |
| তথ্য সংশোধনের পর বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় মূল সনদের কপি সরবরাহ | বিনা ফিসে | বিনা ফিসে |
| বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় জন্ম নিবন্ধন সনদের নকল কপি সরবরাহ | ৫০ টাকা | ১ ডলার |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে ফি তুলনামূলক বেশি হতে পারে এবং অতিরিক্ত প্রমাণপত্র লাগতে পারে।
- বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সংশোধনের আবেদন ও ফি বাংলাদেশ মিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়।
- ফি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট অফিস বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা ভালো।
FAQs
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনে কত টাকা লাগে?
জন্ম তারিখ ছাড়া অন্যান্য তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি সাধারণত ৫০ টাকা। তবে যারা বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি, তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে ১ মার্কিন ডলার (USD) ফি প্রযোজ্য।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করতে কত দিন সময় লাগে?
সাধারণত জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধন সম্পন্ন হতে ৫ থেকে ৭ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে। তবে অফিসের কাজের চাপ, ডকুমেন্ট যাচাই বা বিশেষ ক্ষেত্রে সময় কিছুটা বেশি লাগতেও পারে।
জন্ম নিবন্ধন কতবার সংশোধন করা যায়?
একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ সর্বোচ্চ ৪ বার পর্যন্ত সংশোধন করা যায়। অপ্রয়োজনীয় বা বারবার সংশোধনের আবেদন করলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে, তাই তথ্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকা ভালো।
জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ফরম কোথায় জমা দিতে হবে?
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করার পর ফরমটি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট…
- ইউনিয়ন পরিষদ
- পৌরসভা
- অথবা সিটি কর্পোরেশন অফিসে
সরাসরি জমা দিতে হবে।
পাসপোর্ট দিয়ে কি জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা যায়?
হ্যাঁ। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রমাণপত্র হিসেবে পাসপোর্ট ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে নাম বা জন্ম তারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট একটি গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।
জন্ম নিবন্ধন যাচাই, সংশোধন, আবেদন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় গাইড এক জায়গায় পেতে আমাদের Birth Certificate Guides পেজটি দেখুন।


Thanks for your Advice.