আপনার বা আপনার পরিবারের কারো জন্ম নিবন্ধন করা নেই? ভাবছেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন কী কী কাগজপত্র লাগবে? সত্যি বলতে, জন্ম নিবন্ধনের নিয়মকানুন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই বেশ বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মগুলো একটু আলাদা।
চিন্তার কিছু নেই, আজকের এই আর্টিকেল-এ ২০২৫ সালে শিশু ও বয়স্কদের নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে ঠিক কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং কীভাবে ঝামেলা ছাড়া এই কাজটি সম্পন্ন করবেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। চলুন, ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক।
জন্ম নিবন্ধন কেন এত জরুরি?
একটা সময় ছিল যখন শুধু স্কুলে ভর্তির সময় জন্ম সনদের দরকার হতো। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। পাসপোর্ট করা, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) পাওয়া, বিয়ে রেজিস্ট্রি, এমনকি জমির দলিলেও এখন জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তাই দেরি না করে এটি দ্রুত করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ।
১. শিশুর (০ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত) জন্ম নিবন্ধন করতে কী কী লাগে?
শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মটা তুলনামূলক সহজ। তবে শিশুর বয়সের ওপর ভিত্তি করে দুটি ভাগ আছে।
ক) শিশুর বয়স ০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে হলে:
এই সময়ে জন্ম নিবন্ধন করা সবচেয়ে সহজ এবং সরকারি ফি-ও একদম ফ্রি।
- ইপিআই (EPI) বা টিকার কার্ড: হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকর্মী প্রদত্ত টিকার কার্ডের ফটোকপি।
- হাসপাতালের ছাড়পত্র: হাসপাতালে জন্ম হলে সেখানককার বার্থ সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র।
- বাবা-মায়ের এনআইডি (NID): বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
- বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন: (সতর্কতা: ২০২৫ সালের নিয়ম অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যাদের জন্ম, তাদের বাবা-মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক হতে পারে। তবে শিশুর বয়স কম হলে অনেক সময় শুধু এনআইডি দিয়েই কাজ চলে যায়, এটি স্থানীয় ইউনিয়ন বা পৌরসভা ভেদে ভিন্ন হতে পারে।)
- ছবি: শিশুর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- ঠিকানার প্রমাণ: বাসা ভাড়ার রসিদ, হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা বিদ্যুৎ বিলের কপি।
খ) শিশুর বয়স ৪৬ দিন থেকে ৫ বছরের মধ্যে হলে:
- টিকার কার্ড বা প্রত্যয়নপত্র: টিকার কার্ড হারিয়ে গেলে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের প্রত্যয়নপত্র লাগবে।
- ছবি: পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (১ কপি)।
- বাবা-মায়ের কাগজপত্র: বাবা ও মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ ও এনআইডি কার্ড।
- আবাসিক প্রমাণপত্র: বিদ্যুৎ/গ্যাস বিল বা কর পরিশোধের রসিদ।
২. বয়স্কদের (৫ বছরের বেশি) জন্ম নিবন্ধন করতে কী কী লাগে?
সমস্যাটা মূলত এখানেই হয়। যারা প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু এখনো জন্ম নিবন্ধন করেননি, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মটা একটু কড়াকড়ি।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: আপনি যদি পড়াশোনা করেন, তবে পিএসসি (PSC), জেএসসি (JSC) বা এসএসসি (SSC) পাসের সার্টিফিকেটের ফটোকপি। এতে জন্ম তারিখ প্রমাণ করা সহজ হয়।
- ডাক্তারি সনদ (যদি পড়াশোনা না থাকে): যদি কোনো শিক্ষাগত সনদ না থাকে, তবে সরকারি হাসপাতালের এমবিবিএস ডাক্তারের কাছ থেকে বয়সের প্রমাণপত্র বা প্রত্যয়ন নিতে হবে।
- বাবা-মায়ের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি:
- সবচেয়ে বড় জটিলতা: আপনার বয়স যদি ১৮+ হয়, তবুও অনেক সময় সার্ভার বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নম্বর চায়। বাবা-মা জীবিত থাকলে তাদের আগে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন করিয়ে নিতে হবে।
- বাবা-মা মৃত হলে: তাদের মৃত্যু সনদ (Death Certificate) জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের জন্ম নিবন্ধন না থাকলেও চলবে (তবে মৃত্যু সনদটি অনলাইনে এন্ট্রি থাকা ভালো)।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (যদি থাকে): আপনার যদি এনআইডি থাকে কিন্তু জন্ম নিবন্ধন না থাকে, তবে এনআইডি কার্ডের কপি।
- নাগরিকত্ব সনদ: চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদ।
- ঠিকানার প্রমাণ: হালনাগাদ চৌকিদারি ট্যাক্স বা পৌর করের রসিদ, জমি বা বাসার দলিল/খতিয়ানের কপি।
জন্ম নিবন্ধন ফি (সরকারি রেট)
দালালদের খপ্পরে পড়বেন না। সরকার নির্ধারিত ফি খুবই কম
| বয়স | জন্ম নিবন্ধন ফি |
|---|---|
| ০ – ৪৫ দিন | ফ্রি |
| ৪৬ দিন – ৫ বছর | ২৫ টাকা |
| ৫ বছরের বেশি | ৫০ টাকা |
বোনাস টিপস
১. অনলাইন বনাম অফলাইন: আবেদনটি এখন অনলাইনেই করতে হয় (bdris.gov.bd)। আবেদন করার পর ফর্মটি প্রিন্ট করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কাউন্সিলর অফিস বা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হয়।
২. মোবাইল নম্বর: আবেদনের সময় সচল মোবাইল নম্বর দিন, কারণ ওটিপি (OTP) আসবে।
৩. নামের বানান: বাবা-মায়ের এনআইডি বা আপনার স্কুল সার্টিফিকেটের সাথে মিলিয়ে ইংরেজি ও বাংলা নামের বানান হুবহু এক রাখুন। সামান্য ভুল হলে পরে সংশোধনের জন্য অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
৪. ২০০১ সালের আগের জন্ম: আপনার জন্ম যদি ২০০১ সালের আগে হয়, তবে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন ছাড়াও অনেক সময় আবেদন গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রে তাদের এনআইডি কার্ডের তথ্য দিলেই চলে। তবে এটি নিশ্চিত হতে আপনার স্থানীয় নিবন্ধকের সাথে কথা বলে নেওয়াই ভালো।
শেষ কথা
জন্ম নিবন্ধন নাগরিক হিসেবে আপনার প্রথম পরিচয়। অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে আজই আবেদন করে ফেলুন।
আপনার যদি জন্ম নিবন্ধন নিয়ে আরও কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকে বা কোনো ধাপে আটকে যান, তবে নিচে কমেন্ট করতে পারেন। আমি সাধ্যমতো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব!

