বর্তমান সময়ে আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে জন্ম নিবন্ধন বা Birth Certificate এর প্রয়োজন হয়। একসময় শুধু বাংলায় লেখা জন্ম সনদ দিয়েই সব কাজ চলে যেত, কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে এসে পরিস্থিতি বদলেছে। পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, ভিসা প্রসেসিং কিংবা নতুন চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে জন্ম সনদটি অবশ্যই ইংরেজিতে থাকা বাধ্যতামূলক।
অনেকেই হঠাৎ করে যখন দেখেন তাদের জন্ম সনদটি শুধু বাংলায়, তখন বেশ চিন্তায় পড়ে যান। ভাবেন, হয়তো অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে বা দালাল ধরতে হবে। কিন্তু সত্যি বলতে, সঠিক নিয়মটি জানা থাকলে আপনি নিজেই খুব সহজে আপনার জন্ম সনদ বাংলা থেকে ইংরেজিতে করার জন্য আবেদন করতে পারেন।
আজকের এই ব্লগে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব কীভাবে আপনি আপনার জন্ম নিবন্ধনটি ইংরেজিতে করবেন।
কেন জন্ম সনদ ইংরেজিতে করা জরুরি?
আগে চলুন জেনে নিই, ঠিক কী কী কারণে আপনার জন্ম সনদটি দ্রুত ইংরেজিতে করে নেওয়া উচিত:
- পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়ন: ই-পাসপোর্ট (e-Passport) বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, যেটাই করতে যান না কেন, আপনার তথ্যের সাথে জন্ম সনদের ইংরেজি বানানের হুবহু মিল থাকতে হবে।
- বিদেশে পড়াশোনা ও ভিসা: আপনি যদি স্টুডেন্ট ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বিদেশে যেতে চান, তবে আপনার সব ডকুমেন্টের ইংরেজি ভার্সন আবশ্যিক।
- উচ্চশিক্ষা ও ভর্তি: দেশের ভেতরেও এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তির সময় ইংরেজি জন্ম সনদ চাওয়া হয়।
- ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সিয়াল কাজ: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা কেওয়াইসি (KYC) আপডেট করার সময় অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি তথ্য প্রয়োজন হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদন করতে বসার আগেই কিছু ডকুমেন্ট হাতের কাছে স্ক্যান করে বা ছবি তুলে রেডি রাখুন। এতে কাজের সময় কোনো ঝামেলা হবে না।
১. বর্তমান জন্ম সনদের কপি: আপনার কাছে বর্তমানে যে বাংলা জন্ম সনদটি আছে, সেটির একটি স্পষ্ট কপি।
২. এনআইডি কার্ড (NID): আপনার যদি জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড থেকে থাকে, তবে সেটি।
৩. শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: জেএসসি (JSC), এসএসসি (SSC) বা এইচএসসি (HSC) পাসের সার্টিফিকেট। (কারণ এখানে আপনার নামের ইংরেজি বানান সবচেয়ে নির্ভুলভাবে দেওয়া থাকে)।
৪. পিতা-মাতার তথ্য: আপনার বাবা ও মায়ের এনআইডি কার্ড এবং তাদের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনের কপি। (বর্তমানে পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ছাড়া আবেদন করা বেশ কঠিন)।
৫. ট্যাক্স বা ইউটিলিটি বিল: ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল বা পানির বিলের কপি।
জন্ম সনদ বাংলা থেকে ইংরেজি করার নিয়ম
পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত ‘জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধন‘ প্রক্রিয়ার একটি অংশ। চলুন মূল কাজ শুরু করা যাক।
ধাপ ১: বর্তমান অবস্থা যাচাই করা

প্রথমে আপনাকে জন্ম নিবন্ধন চেক করে দেখতে হবে আপনার বর্তমান জন্ম সনদটি অনলাইনে এন্ট্রি করা আছে কি না।
- আপনার মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে everify.bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে যান।
- আপনার ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিন।
- যদি দেখেন আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম এবং ঠিকানা শুধু বাংলায় দেখাচ্ছে, তার মানে আপনাকে এটি সংশোধন করে ইংরেজি তথ্য যুক্ত করতে হবে।
ধাপ ২: অনলাইনে সংশোধনের আবেদন
- এবার সরাসরি bdris.gov.bd ওয়েবসাইটের ‘জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধন’ অপশনে প্রবেশ করুন।
- আপনার জন্ম নিবন্ধন নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে লগইন করুন।
- এখানে আপনি একটি ফর্ম দেখতে পাবেন। ফর্মে ‘কী সংশোধন করতে চান’ এমন একটি অপশন থাকবে।
- সেখান থেকে একে একে সিলেক্ট করুন: ‘নিজ নাম (ইংরেজিতে)’, ‘পিতার নাম (ইংরেজিতে)’, ‘মাতার নাম (ইংরেজিতে)’ এবং ‘ঠিকানা (ইংরেজিতে)’।
ধাপ ৩: সঠিক ইংরেজি বানান টাইপ করা
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আপনার এসএসসি (SSC) সার্টিফিকেট বা এনআইডি (NID) কার্ডে নামের বানান ঠিক যেভাবে আছে, হুবহু সেভাবে এখানে টাইপ করুন। একটি স্পেস বা অক্ষরের ভুলও পরবর্তীতে বড় ভোগান্তির কারণ হতে পারে। ঠিকানা লেখার সময়ও আপনার এনআইডি কার্ড অনুসরণ করুন।
ধাপ ৪: প্রমাণপত্র আপলোড

আপনি যে নামের বানানগুলো ইংরেজিতে দিলেন, তার সপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে। ‘সংযুক্ত’ অপশনে ক্লিক করে আপনার এসএসসি সার্টিফিকেট এবং এনআইডি কার্ডের স্ক্যান কপি আপলোড করে দিন। ফাইলের সাইজ যেন নির্দিষ্ট সীমার (সাধারণত 2MB এর নিচে) মধ্যে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
ধাপ ৫: সাবমিট ও প্রিন্ট
সব তথ্য ঠিক থাকলে আবেদনটি সাবমিট করুন। সাবমিট করার পর আপনি একটি অ্যাপ্লিকেশন আইডি (Application ID) সহ একটি পিডিএফ ফর্ম পাবেন। ফর্মটি ডাউনলোড করে রঙিন প্রিন্ট করে নিন।
আবেদন জমা ও ফি প্রদান
অনলাইনে তো আবেদন করার পর, জন্ম নিবন্ধন তথ্য সংশোধনের জন্য সরকারিভাবে নির্দিষ্ট একটি ফি (সাধারণত ১০০ টাকা) নির্ধারণ করা আছে। এই ফি আপনি চালানের মাধ্যমে বা অনেক সময় সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা অফিসে নগদ জমা দিতে পারেন।
এরপর প্রিন্ট করা ফর্মটির সাথে আপনার আপলোড করা সব ডকুমেন্টের ফটোকপি যুক্ত করুন। তারপর আপনার এলাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিন।
সাধারণ কিছু ভুল যা অনেকেই করেন (সতর্কতা)
- পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকা: ২০০১ সালের পর যাদের জন্ম, তাদের জন্ম সনদ সংশোধনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ডিজিটাল জন্ম সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই বাবা-মায়ের সনদ না থাকলে আগে সেটি করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
- বানান চেক না করা: সাবমিট করার আগে অন্তত তিনবার আপনার সার্টিফিকেটের সাথে মিলিয়ে নামের বানান চেক করুন।
- অস্পষ্ট ডকুমেন্ট: ঘোলা বা অস্পষ্ট ছবি আপলোড করলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। স্ক্যানার ব্যবহার করে ক্লিয়ার ছবি দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
জন্ম সনদ ইংরেজিতে করতে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণত কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ৩ থেকে ৭ থেকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে সার্ভারের অবস্থা বা অফিসের কাজের চাপের ওপর ভিত্তি করে সময় কম-বেশি হতে পারে।
আমি কি মোবাইল দিয়ে আবেদন করতে পারব?
হ্যাঁ, আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনটি দিয়ে ব্রাউজারে গিয়ে খুব সহজেই আবেদন করতে পারবেন। তবে ডকুমেন্ট আপলোডের সুবিধার্থে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা ভালো।
আমার তো শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো সার্টিফিকেট নেই, আমি কী করব?
সেক্ষেত্রে আপনি আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট (যদি থাকে) অথবা টিকার কার্ড প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
শেষ কথা
জন্ম সনদ বাংলা থেকে ইংরেজিতে রূপান্তর করা এখন আর আগের মতো কঠিন কিছু নেই। সরকারি সার্ভার এখন বেশ উন্নত এবং ইউজার ফ্রেন্ডলি। একটু সময় নিয়ে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে উপরের নিয়মগুলো মেনে আবেদন করলে আপনি নিজেই দালাল ছাড়াই এই কাজটি করে ফেলতে পারবেন।
আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য সহায়ক হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন নিয়ে আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে বা আবেদন করার সময় কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে যান, তবে নিচে কমেন্ট বক্সে আমাদের জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত আপনার সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব।

