নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন এখন আর আগের মতো ঝামেলার নয়। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার করে খুব সহজেই অনলাইনে আবেদন করা যায়, আর প্রয়োজন হলে মাত্র কয়েকটি কাগজপত্র নিয়ে স্থানীয় অফিসে জমা দিলেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
তবে অনেকেই ঠিক কোন ধাপে কী তথ্য দিতে হবে, কোথায় ভুল হওয়ার সুযোগ থাকে, কিংবা আবেদন সাবমিট করার পর কী করতে হবে এসব নিয়ে দ্বিধায় থাকেন।
এই আর্টিকেলটিতে পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে প্রথমবার করলেও আপনি ভুল না করেন। অনলাইনে ফরম পূরণ থেকে শুরু করে আবেদন প্রিন্ট করা পর্যন্ত সবকিছুই এখানে সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জন্ম নিবন্ধন করতে কি কি লাগে?
নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র ও তথ্য আগে থেকে প্রস্তুত রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ঠিকভাবে না থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া দেরি হতে পারে বা রিজেক্টও হতে পারে। নিচে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যাখ্যা করা হলো:
১) শিশুর জন্মের প্রমাণপত্র
জন্ম কোথায় হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রমাণপত্র ভিন্ন হতে পারে।
- হাসপাতালে জন্ম হলে: হাসপাতালের জন্ম সনদ/সার্টিফিকেট
- বাসায় জন্ম হলে: সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউপি মেম্বারের জন্ম প্রত্যয়নপত্র
এই কাগজটি জন্ম তারিখ, সময়, লিঙ্গ, মায়ের নাম ইত্যাদি নিশ্চিত করে।
২) বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন
শিশুর তথ্য যাচাই করতে বাবা-মায়ের পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- উভয় অভিভাবকের NID থাকলে সবচেয়ে ভালো
- যদি NID না থাকে, অন্তত জন্ম নিবন্ধন নম্বর লাগবে
নোটঃ নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা–সব তথ্য একই থাকতে হবে।
৩) ঠিকানার প্রমাণ (বাসস্থান)
শিশুর জন্ম নিবন্ধন কোন ইউনিয়ন/পৌরসভায় হবে তা নির্ধারণের জন্য বাসস্থানের তথ্য লাগে।
- বাবা-মায়ের NID এর ঠিকানা
- অথবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সার্টিফিকেট (যেখানে আবেদন করা হবে)
৪) শিশুর নাম (বাংলা ও ইংরেজি)
অনলাইনে বা অফলাইনে ফর্ম পূরণ করতে শিশুর পূর্ণ নাম সঠিকভাবে দিতে হয়।
- বাংলা নাম
- ইংরেজি নাম (পাসপোর্টের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)
৫) অভিভাবকের মোবাইল নম্বর
আবেদনের OTP, আপডেট, ভেরিফিকেশন–সবই অভিভাবকের মোবাইল নম্বরে আসে। তাই সক্রিয় একটি নম্বর দিতে হবে।
৬) অন্যান্য তথ্য যা ফর্মে লাগবে
- শিশুর জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান
- বাবা-মায়ের পেশা
- বাবা-মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা
- শিশুর লিঙ্গ
- পরিবারের সদস্যসংখ্যা
এসব তথ্য সঠিকভাবে দিলে ভেরিফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন হয়।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরম পূরণ করার নিয়ম
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার প্রক্রিয়াটি মূলত পাঁচটি সহজ ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি ধাপে কিছু তথ্য সঠিকভাবে দিলে পুরো আবেদনটি খুব দ্রুত ভেরিফাই হয়ে যায়।
নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলেই আপনি নিশ্চিন্তে একটি সঠিক ও ভেরিফাইড জন্ম নিবন্ধনের আবেদন সম্পন্ন করতে পারবেন।
ধাপ ১: শিশুর পরিচিতি ও জন্মস্থানের ঠিকানা দিন
অনলাইনে নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন শুরু করতে প্রথমেই আপনাকে bdris.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে গেলে একটি ফরম দেখতে পাবেন, যেখান থেকে পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।

এখানে প্রথম কাজ হলো জন্ম নিবন্ধন কোন ঠিকানায় করতে চান সেটি নির্বাচন করা। সাধারণত শিশুর জন্ম যে এলাকায় হয়েছে বা পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা যেখানে, সেই ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনই নির্বাচন করতে হবে।
ভুল এলাকা সিলেক্ট করলে আবেদন পরে মিলবে না বা বাতিল হয়ে যেতে পারে।

এরপর আসে শিশুর নাম লেখার অংশ। নাম লিখতে এখানে কিছু নিয়ম মানতে হয়, যাতে ভবিষ্যতে সংশোধনের ঝামেলা না হয়ঃ
- নাম দুই ভাগ হলেঃ প্রথম অংশ প্রথম ঘরে, শেষ অংশ শেষ ঘরে।
- নাম তিন ভাগ হলেঃ প্রথম দুটি অংশ প্রথম ঘরে, শেষ অংশ শেষ ঘরে।
- নাম এক শব্দ হলেঃ শুধু শেষ অংশের ঘরটি পূরণ করবেন, প্রথম অংশ খালি থাকবে।
একই নিয়মে ইংরেজি নামও দিতে হবে। পাসপোর্ট বা ভবিষ্যৎ সরকারি কাগজপত্রে ইংরেজি নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই নিশ্চিত হয়ে সঠিকভাবে লিখতে হবে।
সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ হলে পেইজের ডান পাশে থাকা “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন। এরপরের ধাপগুলোতে অতিরিক্ত তথ্য দিতে হবে, যা দিয়ে জন্ম নিবন্ধনের ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়।
ধাপ ২: পিতা ও মাতার তথ্য দিন
এই ধাপে শিশুর জন্ম নিবন্ধন ভেরিফাই করার জন্য পিতা ও মাতার তথ্য প্রদান করতে হয়। এখানে মূলত বাবা–মায়ের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর (BRN) এবং জাতীয়তা সিলেক্ট করলেই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের নাম দেখাবে। যেহেতু এই নামগুলো সরকারি ডাটাবেস থেকে আসে, তাই এগুলো আপনি পরিবর্তন বা এডিট করতে পারবেন না।

এই কারণে আবেদন শুরু করার আগে নিশ্চিত হওয়া জরুরি যে পিতা–মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ অনলাইনে আপডেট করা আছে কিনা। তাই অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন যাচাই করে নিন কেননা যদি তাদের BRN অনলাইনে না থাকে, তাহলে শিশুর আবেদন এগোবে না। সেক্ষেত্রে প্রথমে বাবা–মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ অনলাইন করে নিতে হয়, তারপর শিশুর আবেদন জমা দেওয়া সম্ভব।
তবে শিশুর জন্ম সাল যদি ২০০০ বা তার আগের হয়, তাহলে কিছু ব্যতিক্রম থাকে। এ ক্ষেত্রে পিতা–মাতার অনলাইন BRN বাধ্যতামূলক নয়, সরাসরি তাদের নাম লিখে দিলেও আবেদন সম্পন্ন করা যায়।
সব তথ্য সঠিকভাবে বসানোর পর পেইজের “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করে পরবর্তী ধাপে যান।
ধাপ ৩: স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দিন
এই ধাপে আপনাকে পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা দুটি তথ্যই সঠিকভাবে দিতে হবে। ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দিলে আবেদন কোন অফিসে যাবে, কে এটি ভেরিফাই করবে সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়।
শুরুতে পেইজে “কোনটিই নয়” বাটনে ক্লিক করতে হবে। এতে করে নতুনভাবে ঠিকানা নির্বাচন করার অপশন খুলে যায়। এরপর আপনার সামনে স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার আলাদা দুটি সেকশন দেখা যাবে।
যদি শিশুর জন্মস্থান এবং পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা একই হয়, তাহলে নির্দিষ্ট বক্সে টিক দিন। এতে করে একই ঠিকানা আবার লিখতে হবে না। একইভাবে, যদি বর্তমান ঠিকানাও স্থায়ী ঠিকানার মতোই হয়, তবে সেই বক্সেও টিক দিতে পারেন।
তবে যদি স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা আলাদা হয়, তাহলে ম্যানুয়ালি বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকা নির্বাচন করে ঠিকানা পূরণ করতে হবে।
সব তথ্য যাচাই করার পর “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন। এরপরের ধাপে আবেদনকারীর তথ্য দিতে হবে।
ধাপ ৪: আবেদনকারীর তথ্য দিন
এই ধাপে আপনাকে সেই ব্যক্তির তথ্য দিতে হবে যিনি জন্ম নিবন্ধনের আবেদনটি সম্পূর্ণ করছেন। যদি শিশুর জন্ম নিবন্ধন করা হয়, সাধারণত তার পিতা, মাতা বা আইনগত অভিভাবকই আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত হন।
তাই আবেদনকারীর পরিচয় ঠিকভাবে নির্বাচন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আবেদনটি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজের জন্য করা হয়, তাহলে তিনি নিজেই আবেদনকারী হিসেবে “নিজে” অপশনটি নির্বাচন করবেন। আর যদি অন্য কেউ এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তাহলে আবেদনকারী ও নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির আত্মীয়তা সম্পর্কটি সঠিকভাবে সিলেক্ট করতে হবে। যেমনঃ পিতা, মাতা, ভাই, বোন বা অভিভাবক।
এরপর আবেদনকারীর মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিন। সব নোটিফিকেশন, OTP এবং আপডেট এই নম্বরেই আসে, তাই একটি সক্রিয় নম্বর ব্যবহার করা জরুরি।
সব তথ্য সঠিকভাবে সিলেক্ট ও পূরণ করার পর “পরবর্তী” বাটনে ক্লিক করুন। এ পর্যন্ত আসার মানে হলো আপনার জন্ম নিবন্ধন আবেদন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে আপনি আবেদনকপি প্রিন্ট করতে পারবেন।
ধাপ ৫: জন্ম নিবন্ধন আবেদন ফরম প্রিন্ট করুন
সব তথ্য সফলভাবে সাবমিট করার পর সিস্টেম আপনাকে জন্ম নিবন্ধন আবেদনপত্র প্রিন্ট করার অপশন দেবে। এই আবেদন কপিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই আপনাকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন অফিসে জমা দিতে হবে।
প্রিন্ট করার সময় একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, Headers and Footers অবশ্যই অন থাকবে। কারণ হেডারেই থাকে আপনার Application ID, যা মূলত আপনার আবেদন ট্র্যাক করার একমাত্র শনাক্তকারী নম্বর। যদি এটি দেখা না যায় বা হারিয়ে যায়, তাহলে আবেদন খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাই প্রিন্ট করার সময়ঃ
- Print ডায়ালগ খুললে “More Settings” এ ক্লিক করুন
- “Headers and Footers” অপশনে টিক দিন
- তারপর প্রিন্ট নিন
আবেদনপত্র প্রিন্ট হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (যেমন জন্মের প্রমাণপত্র, বাবা-মায়ের NID/BRN কপি ইত্যাদি) আবেদন ফরমের সাথে সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট অফিসে জমা দিন।
এটাই জন্ম নিবন্ধনের অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ।
FAQs
জন্ম নিবন্ধন কিভাবে করতে হয়?
জন্ম নিবন্ধন করতে হলে প্রথমে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। আবেদন সাবমিট করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে গিয়ে যাচাইয়ের জন্য জমা দিতে হয়।
নতুন জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে কি কি লাগে?
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র শিশুর/ব্যক্তির বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে ৫ বছরের বেশি বয়স হলে অতিরিক্ত ডকুমেন্টস, যেমনঃ জন্ম প্রমাণপত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ, টিকা কার্ড ইত্যাদি সংযুক্ত করতে হয়। বয়স যত বেশি, যাচাই প্রক্রিয়াও তত কঠোর হয়।
জন্ম নিবন্ধন কোথায় করতে হয়?
অনলাইনে আবেদন পূরণ করার পর নির্ধারিত কাগজপত্রসহ আবেদনকারীকে তার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন অফিসে উপস্থিত হয়ে চূড়ান্ত যাচাই সম্পন্ন করতে হয়।
জন্ম নিবন্ধন কখন করতে হয়?
আইন অনুযায়ী শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করা উচিত। তবে কোন কারণে এই সময়সীমার মধ্যে করা সম্ভব না হলে ৫ বছরের মধ্যে অবশ্যই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। বয়স যত বাড়বে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও তত বাড়বে।
জন্ম নিবন্ধন কি দুইবার করা যায়?
না। জন্ম নিবন্ধন কখনোই দ্বিতীয়বার করা যায় না। সিস্টেমে আগে থেকে নিবন্ধিত তথ্য থাকলে ডুপ্লিকেট হিসেবে দেখায় এবং আবেদন গ্রহণ করা হয় না। তাই একবার সঠিকভাবে জন্ম নিবন্ধন করলেই তা স্থায়ীভাবে কার্যকর থাকে।
জন্ম নিবন্ধন যাচাই, সংশোধন, আবেদনসহ প্রয়োজনীয় সব গাইড এক জায়গায় পেতে আমাদের Birth Certificate Guides পেজটি দেখুন।


আমি জন্ম নিবন্ধন আবেদন করতে চাই
আবেদন সংক্রান্ত বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ অনলাইনে নতুন জন্ম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার নিয়ম
Thanks for the services you have given .
Thank you so much.
জন্ম নিবন্ধন ইংরেজি করে লাগবে। কী করব?